‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্য’- সত্যজিৎ রায়ের ‘ক্যালকাটা ট্রিলজি’ সম্পর্কে লিখিত ও পঠিত বিশ্লেষণের সংখ্যা কোনোভাবেই কম নয়। পরিসরের স্বল্পতা এবং লেখকের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করেই বর্তমান রচনার শিরোনামটি ভাবা হয়েছে। নৈতিকতা (ethics) এবং মূল্যবোধের (morality) সঠিক সংজ্ঞা নিরুপণ করা আজও পুরোপুরি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কাজটা আরো কঠিন হয়ে যায় যখন প্রেক্ষাপট হিসাবে থাকে সাহিত্য বা সিনেমার মত মাধ্যম, সমকালীন শব্দকোষ অনুযায়ী যাদের ‘high art’ বলা যেতে পারে। অতি সরলীকরণ দোষে দুষ্ট হওয়ার ঝুঁকিটুকু নিয়েই বর্তমান প্রবন্ধে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধকে দুটি সামান্য আলাদা আদর্শ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ফরাসি দার্শনিক ও নব্য ইতিহাসবাদের প্রবক্তা Michael Foucault-এর অনুকরণে বলা যেতে পারে – নৈতিকতা একপ্রকার সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মূল্যবোধের দায়বদ্ধতা ব্যক্তিবিশেষের কাছে। এই আপাত-সরল উক্তির মধ্যে অবশ্য এক গভীর ব্যঞ্জনার আভাস পাওয়া যায়। বিশেষ করে ১৯৮২ সালের রণজিত গুহ’র ‘সাবঅল্টার্ণ স্টাডিজ’-এর প্রচারের ফলে আমরা জেনেছি সামাজিক মানুষের অবস্থান কোনো স্বয়ংক্রিয় ঘটনা নয় – তা নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের আর্থসামাজিক অবস্থান, বড় হয়ে ওঠা, ভাষা আর নানাবিধ মানসিক আদান-প্রদানের উপর। যদিও সমাজবদ্ধ কোনো ব্যক্তিবিশেষই এই আবর্তের বাইরে নন, সত্যজিৎ রায় তাঁর ফিল্মগুলির মাধ্যমে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে চেয়েছেন যাকে সেলফ-রিফ্লেক্সিভ বলা চলে। নিজের অবস্থানের অমোঘতাকে স্বীকার করেই সত্যজিৎ তাঁর চরিত্রগুলির মাধ্যমে সেই অমোঘতার কারণগুলি দেখাতে চান। বর্তমান প্রবন্ধের দ্বিতীয় ও শেষ পয়েন্টগুলিও এই সেলফ-রিফ্লেক্সিভিটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সত্যজিতের ছবিতে ভিক্টোরিয়ান এবং আধুনিক মূল্যবোধের দ্বান্দ্বিক অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট, এবং সাধারণ বিনোদনের সীমানা ছাড়িয়ে ক্যালকাটা ট্রিলজি এভাবেই হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ এক সামাজিক দলিল যা স্রষ্টা, চরিত্র এবং পাঠক – এই তিন গোষ্ঠিকে সচেতন করে দেয় তাদের অবস্থানগত সীমাবদ্ধতা এবং দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কে। বিভিন্ন চমকপ্রদ সিনেম্যাটিক প্রযুক্তির সাহায্যে ‘সীমাবদ্ধ,’ ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ এবং ‘জন অরণ্য’ আমাদের এই উপলব্ধির মুখেই দাঁড় করিয়ে দেয়।
দ্বান্দ্বিকতার রূপরেখা : সত্যজিৎ রায়ের ‘ক্যালকাটা ট্রিলজি’ এবং সমকালীন নীতি ও মূল্যবোধ
3
